সম্পাদকীয়

লালবাগ যার পথে ছাড়ানো ইতিহাস -মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ

বিশেষ প্রতিবেদন,ডে বার্তা নিউজ ডেস্কঃ মুর্শিদাবাদ  জেলার ঐতিহাসিক শহর লালবাগ। মুর্শিদাবাদের এলোমেলো রাস্তাঘাটে ও ঘিঞ্জি গলির আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ব্রিটিশ আমল ও স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ভারতের ঐতিহাসিক নিদর্শন। হাজারদুয়ারি, নিজামত ইমামবাড়া, কাটরা মসজিদ, জাহানকোষা কামান, ফুটি মসজিদ, বাচ্চেওয়ালি তোপ, জাফরগঞ্জ, খোশবাগ, কাঠগোলা বাগান, জগৎ শেঠের বাড়ি, নসিপুর রাজবাড়ি, নমকহারাম দেউড়ি, চারবাংলার মন্দিরের মতো জায়গাগুলো ছাড়াও এখানের দর্শনীয় স্থানের তালিকা এতটাই লম্বা যে লিখে শেষ করা কঠিন। হাজারদুয়ারি সহ মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর বেশিরভাগই লালবাগে অবস্থিত। রয়েছে লালাবাগের বেশ কিছু দর্শনীয় স্থানও। আগে যেখানে পর্যটকদের কাছে টাঙা গাড়ি ছিল ইতিহাস খ্যাত মুর্শিদাবাদ ঘোরার একমাত্র মাধ্যম৷ সেখানে আজ এসেছে টোটো।
কাটরা মসজিদঃ- নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ’র ইচ্ছা অনুযায়ী বাজারের মধ্যে নির্মাণ করা হয় মসজিদ। বাজার অর্থাৎ কাটরার কাছে সেই মসজিদ। তা থেকেই কাটরা মসজিদ।স্থাপত্যশিল্পের অনন্য নিদর্শন কাটরা মসজিদ। চারদিকে ফুলের বাগান ঘেরা ছোট ছোট লাল ইটের তৈরি চতুর্ভূজাকৃতির মসজিদটির স্থাপত্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। মসজিদের চারকোণে চারটি বুরুজ বা মিনার ছিল বর্তমানে কেবল পশ্চিম দিকের দুটি মিনার আছে বাকি দুটি হারিয়ে গিয়েছে ভূমিকম্পের অতলে। এইভাবে হারিয়ে গিয়েছে মসজিদের পাচঁটির মধ্যে তিনটে গম্বুজ। কিন্তু কোন প্রযুক্তিতে আর্চের উপরে দাঁড়িয়ে গোটা স্থাপত্য, ভাবলে অবাক লাগে! মসজিদের সামনে দিকে রয়েছে পাঁচটি প্রবেশ খিলান। খোলা ও বিস্তৃত ছাদে এক সঙ্গে বহু মানুষ বসে নামাজ পড়তে পারেন। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ চেয়েছিলেন, তাঁর সমাধি মসজিদ সংলগ্ন অঞ্চলে তৈরি করতে। মসজিদে ঢোকার মুখে চোদ্দোটি সিঁড়ি। তার তলায় আছে নবাবের সমাধি।
হাজারদুয়ারি প্রাসাদঃ- মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের তালিকায় পর্যটকদের সবার প্রথমে থাকে হাজারদুয়ারি প্রাসাদ। হাজারদুয়ারি না দেখলে মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শুধুমাত্র ঐতিহ্যে মোড়া এই ঐতিহাসিক হাজারদুয়ারির টানে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক এই লালবাগে আসেন। পাশ দিয়ে বয়ে চলা ভাগীরথীর বুক থেকে হাজারদুয়ারি দর্শন যেন স্বর্গের ছোঁয়ায় নৈসর্গিক হয়ে ওঠে। প্রাসাদটি যেখানে অবস্থিত, সেই পুরো চত্বরটাকে বলে ‘নিজামত কিলা’ বা ‘কিলা নিজামত’, দৃষ্টিনন্দন সবুজ চত্বর ও তার মাঝখানে রয়েছে একটি ঘড়ি টাওয়ার। আসল-নকল মিলিয়ে হাজারটা দরজা রয়েছে তাই নাম হাজারদুয়ারি। বস্তুত হাজার দরজার হলেও এই প্রাসাদের নশোটা দরজা আসল, বাকি একশোটা শত্রুর চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য তৈরি নকল দরজা। ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রাসাদটির প্রতিষ্ঠাতা অষ্টম নবাব হুমায়ুন জাঁ। প্যালেসের স্থাপত্যের শিল্পকলা গ্রিসিয়াস ডোরিক। বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারস-এর ডানকান ম্যাকলিওড ছিলেন এই অনবদ্য স্থাপত্যকলার রূপকার। অনেকে ভুল করে ভাবেন এই প্রাসাদ নবাব সিরাজউদ্দৌলার দৌলার তৈরি। আসলে এই প্রাসাদ তৈরী হয় সিরাজ জমানার পরে। সিরাজের প্রাসাদের নাম ছিল হীরাঝিল প্রাসাদ যা এখন ভাগীরথী নদীতে তলিয়ে গেছে৷ প্রাসাদের মূল প্রবেশপথের সামনে দুটি সিংহের মূর্তি, আর ওপরে ওঠার ছত্রিশটি প্রশস্থ সিঁড়ি। এই প্রাসাদ এখন নবাবি ইতিহাসে সমৃদ্ধ একটা আস্ত মিউজিয়াম। এই অসাধারণ ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায় নবাবী আমলের ব্যবহার্য মূল্যবান সামগ্রী সংরক্ষিত এখানে।
নিজাম ইমামবাড়াঃ- হাজারদুয়ারির অপরপ্রান্তে সাদা ধবধবে নিজাম ইমামবাড়া। এটি ভারতের বৃহৎত্তম শিয়া ইমামবাড়া বলে কথিত। মহররমের মাসের এক থেকে দশ তারিখ পর্যন্ত ইমামবাড়াটি দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। মহরমের এই দশদিন কেবলমাত্র খোলা থাকে। এছাড়া অন্যসময় এর ভিতরে প্রবেশের সুযোগ নেই।
মদিনা মমসজিদঃ- ইমামবাড়া ও হাজারদুয়ারি প্রাসাদের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে চার গম্বুজ বিশিষ্ট ছোট্ট আকৃতির ‘মদিনা মসজিদ’। কথিত আছে সিরাজউদ্দৌলা মায়ের প্রতিজ্ঞা পালনে কারবালা থেকে নিজে পবিত্র মাটি এনে তৈরি করেছিলেন। ভাগীরথীর পূর্ব পাড়ে এটি সিরাজউদ্দৌলার স্থাপত্যশিল্পের একমাত্র নিদর্শন যা এখনো তাঁর স্মৃতি বহন করে।
বাচ্চাওয়ালি তোপঃ- মদিনা মসজিদের পাশেই রাখা আছে এক বিশাল কামান যার নাম ‘বাচ্চাওয়ালি তোপ’। নবাব হুমায়ুন জাঁ-র সময় এটি ভাগীরথী নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। কামানের এই ‘বাচ্চাওয়ালি’ নামকরণের গল্প লোকমুখে প্রচলিত আছে। কথিত আছে এই কামানটি কেবলমাত্র একবারই দাগা হয়েছিল। কিন্তু তোপ দাগার শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে আশেপাশে সেইসময় গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভপাত ঘটে যায়। সেই থেকেই এর নাম দেওয়া হয় ‘বাচ্চাওয়ালি তোপ’। এর পরে কামানটি আর কোনোদিন ব্যবহার করা হয়নি।
কাঠগোলা প্রাসাদঃ- কাঠগোলা বাগানের উঁচু কারুকার্যখচিত গেট দিয়ে ঢুকে সুপ্রশস্থ আম বাগানের মাঝ বরাবর রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে ডান দিকে পড়বে একটি মিনি চিড়িয়াখানা ও অ্যাকুয়ারিয়াম আর বাম দিকে রয়েছে বিখ্যাত পাশ্চাত্য ভাস্কর মাইকেলেঞ্জেলোর একটি মূর্তি। তার পাশে রয়েছে একটি গুপ্ত পথ। শোনা যায় এই গুপ্তপথ ভাগীরথী নদীর সঙ্গে যুক্ত। আম বাগানকে পিছনে ফেলে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেলে কাঠগোলা প্রাসাদে। সামনে বিশাল দীঘি এবং বিস্তীর্ণ বাগান দিয়ে ঘেরা এই কাঠগোলা প্রাসাদ হাজারদুয়ারির পরেই মুর্শিদাবাদের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। এই প্রাসাদে অনেক সিনেমা ও টিভি সিরিয়ালের শুটিং হয়েছে। রাস্তা ধরে আরেকটু এগিয়ে রয়েছে একটি মন্দির ও আরও একটা বড় বাগান। এই বাগানের মাঝখানে রয়েছে চারদিক খোলা একটি উচু মঞ্চ। মঞ্চটির চারদিকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা যায়। এর পরেই রয়েছে খুব সুন্দর একটি জৈন মন্দির ‘আদিনাথ মন্দির’ যার দেওয়ালে নানারকম ভাস্কর্য্য। চারপাশে বিশাল এলাকা জুড়ে গোলাপ ফুলের বাগান। সামনে আরেকটি পুকুর। এখানে নৌকাবিহারের জন্য ছোট ছোট বোট রয়েছে।
জগৎ শেঠের বাড়িঃ- জগৎ শেঠের বাড়িও এখন সংগ্রহশালা। তৎকালীন মুর্শিদাবাদের অন্যতম ধনপতি ছিলেন জগৎশেঠ। বাড়ির চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর পাথরের মূর্তি, ফোয়ারা। প্রায় অন্ধকারাছন্ন সরু সিঁড়ি বেয়ে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করলে দেখা যায় একটা সংগ্ৰহশালা। সংগ্ৰহশালায় রয়েছে জগৎ শেঠের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস, বাসনপত্র, ছবি, বাংলার বিখ্যাত মসলিন শাড়ি ইত্যাদি আরো অনেক জিনিস। সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে অপর প্রান্তে বেরিয়ে চৌহদ্দির ভেতরে বাঁ দিকে রয়েছে খুব সুন্দর একটা মন্দির।
নসিপুর রাজবাড়িঃ- মূল সড়কের পাশেই রয়েছে এই প্রাসাদটি। প্রাসাদটিকে দেখে হাজারদুয়ারির ছোট সংস্করণ বলে অনুমান করা যেতে পারে। এলাকার নাম অনুসারে এই প্রাসাদের নামও নসিপুর রাজবাড়ি। প্রাসাদে ওঠার বিশালাকার চওড়া সিঁড়ির দুই পাশে দুই সিংহ-মূর্তি যেন পাহারা দিচ্ছে। সিঁড়ির সামনেই রয়েছে একটি ফোয়ারা। রাজবাড়ির সামনের অংশটি মোটামুট সংরক্ষিত রয়েছে, কিন্তু ভেতরের দিকে পুরোটাই ভগ্নদশা। রাজবাবাড়ির ভেতরে মাঝখানে রয়েছে অনেকটা খালি জায়গা ও ঠাকুরবাড়ি, সেখানে বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি।
নসিপুর আখড়াঃ- রামানুজ-অনুগামী লক্ষ্মণ দাস মহারাজ ধর্মীয় প্রচারে মুর্শিদাবাদ এসে জাফরাগঞ্জ এলাকায় এই আখড়া স্থাপন করেন। এটি রঘুনাথের আশ্রম নামেও পরিচিত। ভেতরে এক পাশে রঘুনাথদেবজীর মন্দির রয়েছে। এটি বর্তমানে মুর্শিদাবাদ পৌরসভা কর্তৃক ঘোষিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান। শতাধিক বছরের প্রাচীন এই প্রাসাদটি বয়সের ভারে আজ জরাজীর্ণ অবস্থা। পাশের ভবনে রাখা আছে প্রাচীন যুগের বেবি অস্টিন গাড়ি। কথিত আছে, প্রাচীন যুগের এই বেবি অস্টিন গাড়িটি আশি টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল, যা আজ ছোট একটি গ্যারেজে অযত্নে রাখা আছে। পাশেই আছে সোনার রথ। এছাড়া রয়েছে রূপোর তৈরি আট ফুটের একটি রথ ও তার পাশে আর একটি কাঠের তৈরি রথ। দর্শনার্থীদের জন্য দিনের সব সময়ই এটি খোলা থাকে।
মোতিঝিল পার্কঃ- এই বিশাল ইকো পার্কে ঘুরে দেখার জন্য ব্যাটারি চালিত গাড়ির ব্যবস্থা আছে। রয়েছে লাইট এন্ড সাউন্ড শো এর ব্যবস্থা। বাইরে পার্ক সংলগ্ন স্থানে একটি ক্যাফেটেরিয়া আছে।
প্রয়োজনীয় তথ্যঃ- শুক্রবার হাজারদুয়ারি প্যালেসের মিঊজিয়াম বন্ধ থাকে। শুক্রবার ছাড়া প্রত্যহ সকাল দশটা থেকে বিকাল চারটে পর্যন্ত খোলা থাকে। সর্বত্রই ক্যামেরা নিয়ে যাবার অনুমতি আছে, হাজারদুয়ারী, জগৎ শেঠের বাড়ি এবং কাঠগোলা প্রাসাদের ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ। হাজারদুয়ারি প্যালেসের পূর্বদিকে রয়েছে টিকিট কাউন্টার তার পাশে বিনামূল্যে লোকের রুমে ক্যামেরা ও মোবাইল জমা রাখা যায়। প্রসঙ্গত বলে রাখি এখানে প্রচুর ভুঁয়ো গাইড ঘোরা ফেরা করে। সরকারি পরিচয়পত্র ঝোলানো দেখে তবেই গাইড নেওয়া ভালো অন্যথায় সর্বস্ব খোয়াতে হতে পারে।
কিভাবে যাবেনঃ- শিয়ালদা থেকে লালগোলাগামী যে কোনও ট্রেন সরাসরি মুর্শিদাবাদ যায়। মুর্শিদাবাদ ষ্টেশন থেকে লালবাগ ও হাজারদুয়ারি আসতে হবে অথবা বহরমপুর নেমে সেখান থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে মুর্শিদাবাদের লালবাগ। পুরো শহর ঘুরে দেখার জন্য হাজারদুয়ারীর গেটের সামনে প্রচুর ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় এছাড়া ভাগীরথীর ধারে টোটো স্ট্যান্ড আছে সেখান থেকে টোটো ভাড়া করে ঘোরা যেতে পারে।
_____________________

আরও পড়ুন

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
এখনি যুক্ত হন
Close